সোনা চাঙা, রুপা তেজি, ডলার নিস্তেজ

বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এখনো পূর্ণ গতি পায়নি। পরিস্থিতি সামলাতে দেশে দেশে সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো একের পর এক আর্থিক পুনরুদ্ধার ও প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করছে। অথচ এই অবস্থায় আন্তর্জাতিক বাজারে সোনা ও রুপার দাম যেন রকেটের গতিতে ওপরের দিকে ছুটছে।

গত সপ্তাহে সোনার দাম ৬ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ১ হাজার ৯০০ ডলারের মনস্তাত্ত্বিক পর্যায় অতিক্রম করেছে। আউন্সপ্রতি দাম ১ হাজার ৯০৪ দশমিক ৬০ ডলার পর্যন্ত উঠেছে। সপ্তাহের শেষ দিন শুক্রবার অবশ্য প্রতি আউন্স ১ হাজার ৮৯৯ দশমিক ৮০ ডলারে বিক্রি হয়েছে। তবে গত সপ্তাহে ৫ দিনে সোনার আউন্সপ্রতি দাম মোট ৮০ ডলার বেড়েছে। এ নিয়ে টানা সাত সপ্তাহ ধরে সোনার দাম বাড়ল। আর চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত দাম বেড়েছে ২৪ শতাংশ।

বিশ্লেষকেরা শোনাচ্ছেন আরও বড় শঙ্কার কথা, সোনার দাম এখন বাড়তেই থাকবে। চলতি সপ্তাহেই ২০১১ সালের ৬ সেপ্টেম্বরের আউন্সপ্রতি ১ হাজার ৯২৩ দশমিক ৭০ ডলার ছুঁয়ে ফেলবে এবং শিগগির ২ হাজার ডলারে গিয়ে ঠেকবে।

সোনার দেখাদেখি রুপার দামও বাড়ছে তরতর করে। গত সপ্তাহে রুপার দাম বেড়েছে সোনার প্রায় ৩ গুণ, অর্থাৎ ১৮ শতাংশ। সপ্তাহের শেষ দিনে প্রতি আউন্স রুপার দাম ২২ দশমিক ৮৫ ডলারে উঠেছে, যা ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরের (২৩ দশমিক ৬৪ ডলার) পরে সর্বোচ্চ। চলতি বছরে এ পর্যন্ত পণ্যটির দাম ৩৭ শতাংশ বেড়েছে। অচিরেই রুপার দাম ৩০ ডলারে উঠবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে দেওয়া লকডাউনের কারণে রুপার প্রধান উৎসস্থল লাতিন আমেরিকা থেকে রুপা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে, যা পণ্যটির মূল্যবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা পালন করেছে।

আরবিসি ওয়েলথ ম্যানেজমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জর্জ গেরো বলেন, বর্তমান প্রবণতা হলো, বিনিয়োগকারীরা মনে করেন, তাঁরা বাজারে থাকবেন। এতে সোনা-রুপা দুটিরই দাম বাড়বে।

দামি ধাতুপণ্য কেনাবেচার প্রতিষ্ঠান এমকেএসএসের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আফশিন নবাবি বলেন, ব্যাপক হারে ক্রয়ের প্রবণতা না কমলে এবং সবকিছু আগের মতো স্বাভাবিক না হলে সোনার আউন্সপ্রতি দাম দুই হাজার ডলারে উঠবে।

এসআইএ ওয়েলথ ম্যানেজমেন্ট নামক প্রতিষ্ঠানের প্রধান কৌশলগত কর্মকর্তা কলিন সিয়েসজিনস্কিও বলেন, ‘আমরা ইতিহাসের সর্বোচ্চ দামের কাছাকাছি। এখান থেকে দুই হাজার ডলার খুব বেশি দূরে নয়।’

ওলফ রিসার্চ নামের একটি সংস্থার এক গবেষণায়ও সম্প্রতি বলা হয়েছে, মার্কিন ডলারে সোনার দামে নতুন রেকর্ড হতে চলেছে।

 প্রতি আউন্স সোনা ১ হাজার ৯০০ ডলার ও রুপা ২৩ ডলারে উঠে গেছে

কেন বাড়ছে দাম
করোনাভাইরাসের প্রভাব, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার উত্তেজনা, বৈশ্বিক শেয়ারবাজারের অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারে মার্কিন ডলারের বিনিময় হার দুর্বল হয়ে পড়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীরা ‘সেফ হ্যাভেন’ বা নিরাপদ বিনিয়োগখ্যাত সোনা কেনায় ঝুঁকছেন। এভাবে চাহিদা যত বাড়ছে, সোনা-রুপার দামের পালেও তত হাওয়া লাগছে।

চীন-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার উত্তেজনা বেশ জটিল আকারই ধারণ করতে চলেছে। উত্তেজনার আগুনটা প্রথম জ্বালায় যুক্তরাষ্ট্র। এরপর তাতে ঘি ঢেলে উত্তাপটা বাড়িয়ে দেয় চীন। যেমন গত মঙ্গলবার টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের হিউস্টনে চীনের কনস্যুলেট ৭২ ঘণ্টার (শুক্রবার) মধ্যে বন্ধের নির্দেশ দেয় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। এর জবাবে গতকাল শুক্রবার চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় চেংদু শহরে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের কনস্যুলেট বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে বেইজিং। দুই দেশের এই পাল্টাপাল্টির তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায় সোনার বাজারে।
চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের টানাপোড়েনের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অবস্থাও ভালো নয়। দুইয়ে মিলে সোনার বাজার গরম করে তুলেছে।

ইইউ-যুক্তরাষ্ট্রের পুনরুদ্ধার প্যাকেজ
করোনার প্রভাব মোকাবিলায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত আর্থিক পুনরুদ্ধার ও প্রণোদনা প্যাকেজও সোনার মূল্যবৃদ্ধিতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।
ইইউ নেতারা গত সপ্তাহে ৮৫ হাজার ৭৩৩ কোটি ডলারের প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেন, যা ইইউর ২০২১-২৭ সালের ১ লাখ ১০ হাজার কোটি ইউরোর বাজেটের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।

ডলারের দাম কমছে
আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারে প্রভাবশালী মুদ্রাগুলোর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের ডলারের বিনিময় হার কমছে, যে কারণে বিনিয়োগকারীরা সোনা-রুপা কেনায় ঝুঁকছেন। প্রতিযোগী মুদ্রাগুলোর তুলনায় ডলার ইনডেক্স কমে ইতিমধ্যে ৯৪ দশমিক ৭ পয়েন্টে নেমে গেছে, যা গত মার্চে ১০৩ পয়েন্ট ছিল। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ডলারে বিনিয়োগে আস্থা কমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীরা সোনা-রুপার পেছনে ছুটছেন। অতীতেও বহুবার দেখা গেছে, ডলারের দাম পড়লে বিনিয়োগকারীরা চিরকালীন সেফ হ্যাভেন বা নিরাপদ স্বর্গখ্যাত সোনা-রুপা কেনেন।

সোনার চাহিদা ও ব্যবহার
সোনা সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় জুয়েলারি বা অলংকার তৈরিতে। জুয়েলারির জন্য সর্বোচ্চ ২ হাজার ১০৭ টন বা ৪৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ সোনা ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া বিশ্বজুড়ে সব দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান সোনা মজুত রাখে, যা পরিমাণে ৬৫০ দশমিক ৩ টন বা ১৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ। সোনার বার ও কয়েন বা মুদ্রায় বিনিয়োগ হয় ৮৭০ দশমিক ৬০ টন বা ১৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ। এ ছাড়া এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ডসে (ইটিএফ) রয়েছে ৪০১ টন বা ৯ দশমিক ২১ শতাংশ সোনা।

আইএমএফ ও ইসিবি
বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাও সোনার মজুত রাখে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএএফ) কাছে রয়েছে ২ হাজার ৮১৪ মেট্রিক টন সোনা।
বাংলাদেশ ব্যাংকও সোনা ও রুপার মজুত রাখে। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের মজুত রাখা সোনা-রুপার মূল্যমান ৫ হাজার ৩৬৯ কোটি টাকা।
ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (ইসিবি) কাছে রয়েছে ৫০৪ দশমিক ৮ টন সোনা, যা সংস্থাটির মোট বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের ৩১ শতাংশ।

মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা
করোনার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সার্বিক অর্থনীতি সমস্যার মধ্যে রয়েছে। আবার কর্মীরা কাজ হারাচ্ছেন। আবার পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারগুলো প্রণোদনা প্যাকেজ নিয়ে চলেছে। এর আওতায় ঋণ বিতরণের পরিমাণ বাড়ছে। এই অবস্থায় একদিকে ডলারের দাম কমছে, অন্যদিকে বিনিয়োগকারীরা সোনা-রুপা কেনার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন। এতে পণ্য দুটির দাম আরও বাড়ছে। সব মিলিয়ে সোনা-রুপার দাম বেড়ে গিয়ে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির শঙ্কা তৈরি করছে বলে মনে করা হচ্ছে।

৮০% মজুতই ২৫ দেশে
বিশ্বে জাতীয়ভাবে যে পরিমাণ সোনার মজুত আছে, তার ৮০ শতাংশ মাত্র ২৫টি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে।

সূত্রঃ প্রথম আলো