আছেন আবদুল মতিন খসরু, জাফর ওয়াজেদ ও সিদ্দিকুর রহমান!

6

মোহাম্মদ আবদুল অদুদ : ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু ও তার সাথে যারা শাহাদৎবরণ করেছেন, তাদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার কথা বললেই ঘটনার খলনায়ক হিসেবে ঘাতক খন্দকার মোস্তাকের নামটা চলে আসে। আমরা তখন খুবই ব্যথিত ও লজ্জিত হই। খুবই কষ্ট অনুভব করি। ১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে নবাব সিরাজ-উ দৌলার কাছ থেকে যখন ব্রিটিশ বেনিয়ারা ১৯০ বছরের জন্য আমাদের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়, তখনও একটি নাম আসে ‘মীর জাফর’। শুনেছিলাম, যেখানে মীর জাফর আছে, সেখানে দেশপ্রেমিক মোহনলালও আছে।

ইংরেজ ডাক্তার হলওয়েল ‘অন্ধকূপ হত্যা’ নাটক দ্বারা নবাব সিরাজ-উ দৌলাকে একজন নরঘাতক, কাপুরুষ ও খুনি হিসেবে চিত্রিত করে এদেশের মানুষের কাছে তাকে বিকৃতভাবে তুলে ধরেন এবং তার প্রতি সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্নখাতে পরিচালিত করার অপচেষ্টা করেন। ফলাফল যা হওয়ার তা-ই হয়েছে।দীর্ঘকাল পরে সিকান্দার আবু জাফর তার সিরাজ-উ দৌলা নাটকের মাধ্যমে মানুষের মনে নবাব সিরাজ সম্পর্কে বিরূপ ধারনা বদলে দেন। ততক্ষণে ক্ষতি যা হওয়ার তো হয়েছেই।
খন্দকার মোস্তাকের বাড়ি কুমিল্লা হওয়ায় কুমিল্লার মানুষ হিসেবে জাতীয়ভাবে আমরা যথেষ্ট অপমানিত হয়েছি। মোস্তাকের বাড়ি কুমিল্লায়, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন তিনি বঙ্গবন্ধুর কেবিনেটের সদস্য, খুব সম্ভব পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন এবং আওয়ামী লীগের মত সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতা। সবাই জেনেও এসব পরিচয় আড়াল করে কুমিল্লাকে সামনে নিয়ে আসে এবং ‘অন্ধকূপ হত্যা’র ন্যায় ‘ক্যু’ নাটক মাঠে ছেড়ে দেয়। কুমিল্লাকে ক্যু-এর সাথে অযৌক্তিকভাবে সম্পৃক্ত করার অপচেষ্টা করে।

ওই বন্ধুদের বলছি, আমাদের আছে একজন আবদুল মতিন খসরু, যিনি ইনডিমেনেটি অধ্যাদেশ বাতিল করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের পথ অবমুক্ত করতে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছিলেন। আমি গর্বিত এজন্য যে, আমি যে ভূমিতে জন্মগ্রহণ করেছি, জনাব আবদুল মতিন খসরু সেই আসনের সংসদ সদস্য। তিনি পাঁচবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য, সাবেক আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মাননীয় মন্ত্রী, একই মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি, সুপ্রিম কোর্টের একজন সিনিয়র আইনজীবী এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রেসিডিয়াম সদস্য। আজকের এই দিনে আমরা গর্বিত আমাদের অঞ্চলের কৃতিসন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মতিন খসরু সাহেবের জন্য। আমরা তার সুস্বাস্থ্য ও নেক হায়াত কামনা করি।

একুশে পদকপ্রাপ্ত গর্বিত সাংবাদিক জনাব আলী ওয়াজেদ জাফর, জাফর ওয়াজেদ তখন ডাকসুর সাহিত্য সম্পাদক। আপোষহীনভাবে যিনি সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের দাবিতে সরব ছিলেন, লেখনীর মাধ্যমে যিনি বারংবার এই দাবী প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করেছেন এবং দাবি আদায় না হলে রাজপথ ছাড়বেন না বলে ব্রত নিয়েছিলেন, এমনই এক মানুষের নাম জাফর ওয়াজেদ। তিনি এখন পিআইবির মহাপরিচালক। আমরা তাকে বলি জীবন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার চাইতে গিয়ে যিনি নিজের জীবনকে তুচ্ছজ্ঞান করেন, এমন মানুষ সত্যিই আমাদের অহংকার। অতিসম্প্রতি তিনি ‘বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম নিয়ে গবেষণা ও লেখালেখি’ শিরোনামে এক নিবন্ধে বঙ্গবন্ধুকে বিশ্ববিদ্যালয়, সড়ক, সেতু, হলের নামের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তাকে নিয়ে ব্যাপক গবেষণা, বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ণের উপর গুরুত্বারোপ করেন। অসাধারণ এই লেখালেখি অনবদ্যভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন আমাদের এই অগ্রজ, সাংবাদিক সমাজের অহংকার ও কুমিল্লার আর এক গর্বিত সন্তান জনাব জাফর ওয়াজেদ। ভাইয়ের জন্য অফুরন্ত শুভ কামনা।

এইসাথে আমি আর একজন মানুষের কথা বলব, যার নাম সিদ্দিকুর রহমান। বাড়ি কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার ঝুমুর গ্রামে। তিনি তখন পুলিশ বাহিনীতে এএসআই পদে চাকুরি করতেন, যিনি বঙ্গবন্ধুকে বাঁচাতে গিয়ে ঘাতকের বুলেটের আঘাতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে শাহাদৎ বরণ করেছিলেন, যাকে বলে স্পটডেট। তার এই আত্মদানের কথা মালিবাগে অবস্থিত সিআইডি অফিসের ফটকে তার ছবিসহ উপস্থাপিত করা হয়েছে। আমরা গর্বিত পুলিশ বাহিনীর এই সদস্য এবং আমাদের কুমিল্লার বুড়িচংয়ের কৃতিসন্তান সিদ্দিকুর রহমানের জন্য। তার উত্তর প্রজন্ম দুই নাতি আমার পরিচালিত স্কুলে পড়ার কারণে ব্যাপকভাবে এসম্পর্কে জানার সুযোগ হয়েছে। আমরা এই শোকাহত দিনে তার বিদেহীর আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।

আমি গর্বিত আমার বাবা ভাষাসৈনিক আবদুর রাজ্জাক মাস্টারের জন্য, যিনি পাকিস্তান সরকারের বেতনভুক্ত হয়েও কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে দিতেন তৎকালীন সরকারের বৈষম্যমূলক আচরণের কথা। কাগজের দাম ১২ আনা আর ৬ আনার পার্থক্য বুঝাতেন অতি সহজ সরলভাবে। বাবার কথাও এজন্য আনলাম, তিনিও আমাদের আরেক রত্ন ছিলেন।

সবশেষে আমি শোকাহত ১৫ আগস্টে স্বজন হারানোর বেদনায় কাতর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহেনা আপার প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করছি।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী ও ভাষাসৈনিক আবদুর রাজ্জাক মাস্টারের সন্তান