দেশে দুই দুর্যোগ দেখছেন ফখরুল

1

বন্যা ও করোনাভাইরাসের দুর্যোগের পাশাপাশি দেশে ‘রাজনৈতিক দুর্যোগ’ চলছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

তার দলের অন্যান্য জ্যেষ্ঠ নেতারাও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কঠোর সমালোচনা করেছেন। দলটিকে ‘ভাইরাস’ আখ্যায়িত করেছেন মওদুদ আহমদ।

জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের ৪০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বুধবার বিকালে এক ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় সরকার ও আওয়ামী লীগের এসব সমালোচনা করেন বিএনপি নেতারা।

মির্জা ফখরুল বলেন, “আজকে বাংলাদেশে দুইটা দুর্যোগ চলছে। একটি হচ্ছে প্রাকৃতিক ও স্বাস্থ্য খাতের কোভিড-১৯ এর দুর্যোগ। অন্যটি হচ্ছে রাজনৈতিক দুর্যোগ।

“কোভিডে মানুষের জীবন-জীবিকা বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। আর রাজনৈতিক দুর্যোগের মধ্য দিয়ে এদেশে মানুষের যে মালিকানা ছিল, সেই মালিকানা বিলীন করে দেওয়া হয়েছে। তারা (সরকার) দেশে লুটেরা অর্থনীতি, একটা লুটেরা সমাজ তৈরি করেছে।”

স্বাস্থ্য খাতে ‘চরম অব্যবস্থাপনা’ চলছে অভিযোগ করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, “মানুষের কোনো চিকিৎসা নেই। উদাসীনতা, অজ্ঞতা, ব্যর্থতা স্বীকারও করতে চায় না। মানুষের জীবন নিয়ে ওরা তামাশা করছে।

“এই সরকারকে যদি সরানো না যায় এবং এখানে জনগণের সরকার যদি প্রতিষ্ঠা না করা যায়…। সত্যিকার অর্থে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সেই লক্ষ্যে আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।”

এই অবস্থা থেকে উত্তরণে ‘গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার’ আন্দোলনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান মির্জা ফখরুল।

তিনি বলেন, “দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা, দেশনেত্রীকে মুক্ত করা ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং এখানে লক্ষ মানুষ যারা মামলা-মোকাদ্দমায় জড়িত হয়ে পড়ে আছে, যারা কারাগারে রয়েছে তাদেরকে মুক্ত করা এটা এখন জরুরি একটা বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সংকট শুধু বিএনপির নয়, এটা সমগ্র দেশের, সমগ্র মানুষের।

“আমি মনে করি, বিএনপি তার ভূমিকা ইতোমধ্যে পালন করছে এবং স্বেচ্ছাসেবক দল এই ভূমিকা অতীতে পালন করেছে এবং এখনও করছে। আমাদের এখন সময় এসেছে আমাদের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি করা।”

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানকে নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের বক্তব্যেরও সমালোচনা করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

তিনি বলেন, “কোন অবস্থার প্রেক্ষিতে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সাহেবকে জনগণ সামনে নিয়ে এসেছিল? সেই অবস্থাটা হচ্ছে, ১৯৭২-৭৫ সাল। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের যে চেতনা ছিল, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে যারা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তাদের লক্ষ্য ছিল একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা, একটা গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা হবে এবং জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি আসবে। কিন্তু জনগণ দেখেছে ১৯৭২ সাল থেকে মানুষের মুক্তির বদলে আরও আবদ্ধ হয়েছে, ক্রীতদাস হয়েছে।

“মানুষ মুক্তি তো পাইনি, তারা আরও নির্যাতিত হয়েছে আরও বেশি করে। আমরা সেই সময়ে দেখেছি, এই আওয়ামী লীগ সেদিন শুধুমাত্র ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য সেই সমস্ত স্বপ্নগুলোকে চুরমার করে দিয়ে প্রথমে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছিল, বিশেষ ক্ষমতা আইন করেছিল এবং সব শেষে ক্ষমতাকে ধরে রাখার জন্য তারা একদলীয় শাসন ব্যবস্থা বাকশাল করেছিল।

“ওই অবস্থা থেকে জিয়াউর রহমান পরিবর্তন নিয়ে এসেছিলেন, তিনি একটা নতুন সমাজের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন তার বহুদলীয় গণতন্ত্র, তার মুক্ত অর্থনীতি ও তার ১৯ দফা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে।”

বর্তমান আওয়ামী লীগ নেতাদের সমালোচনা করে ফখরুল বলেন, “এরা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে গণতন্ত্রকে হরণ করবার জন্যে, মানুষের অধিকারকে হরণ করবার জন্য পরিকল্পিতভাবে এক এগারোর পর থেকে ষড়যন্ত্র শুরু করেছে এবং দেশের মানুষের অধিকারগুলোকে কেড়ে নিয়ে চলে গেছে।”

সাড়ে চার ঘণ্টার এই ভার্চুয়াল আলোচনায় প্রধান অতিথি ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

আলোচনায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, “শহীদ জিয়া বিএনপির অঙ্গ সংগঠনগুলো প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এজন্য যে, এসব সংগঠন দলের ভ্যানগার্ড হিসেবে কাজ করবে। আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রকে হরণ করেছে, বাক স্বাধীনতা হরণ করেছে। মানুষ সত্য কথা বলতে পারছে না। সত্য আজকে মিথ্যার কাছে ধামাচাপা পড়ে গেছে।

“এই অবস্থা থেকে উত্তরণে বিএনপির নেতৃত্বে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে যে লড়াই-সংগ্রাম চলছে তাতে আমাদের অঙ্গ সংগঠনগুলোকে ভ্যানগার্ড হিসেবে কাজ করার প্রস্তুতি নিতে হবে।”

স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ বলেন, “বাংলাদেশ দুইটি ভাইরাসে আক্রান্ত। একটা হচ্ছে আওয়ামী লীগ ভাইরাস, আরেকটা হচ্ছে করোনাভাইরাস।

“আওয়ামী ভাইরাসে আমাদের দেশের রাজনীতি গত ১১ বছর আক্রান্ত। এই ভাইরাস আমাদেরকে জর্জরিত করেছে। আমাদের ৩৫ লক্ষ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া আছে, মামলার সংখ্যা এক লক্ষের উপরে চলে গেছে। চিন্তা করে দেখেন এই সরকার বিএনপিকে নিঃশেষ করে দেওয়ার জন্য কত না চেষ্টা করেছে, কিন্তু তারা দলের শক্তিকে কিছুই করতে পারেনি।”

স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, “আওয়ামী লীগের রাজনীতির খবরটা কোথায়? শুধু মুখে, শুধু পত্র-পত্রিকা এবং টেলিভিশনে। সেই রাজনীতিটা কী? শুধু বিএনপির বিরুদ্ধে অপপ্রচার, শুধু শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান, গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা জিয়াউর রহমান তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার।

“তারা কেন এই অপপ্রচার করছে? জিয়াউর রহমান সাহেবকে গালি দেওয়া ছাড়া আওয়ামী লীগের তো কোনো রাজনীতি নেই। কেন নাই? জিয়াউর রহমান রাজনীতি করেছে জনগণের স্বার্থে, জনগণের জন্য। আর আওয়ামী লীগের রাজনীতি হচ্ছে তাদের নিজের স্বার্থে।”

স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, “আমাদের রাজনীতিতে এখন কিছু কথাবার্তা নতুন করে আসছে। কেউ বলেছেন কিছু দিন আগে যে, তাকে জিয়াউর রহমান মন্ত্রী হওয়ার অফার দিয়েছিলেন এবং তিনি প্রত্যাখ্যান করার কারণে তাকে জেলে নেওয়া হয়েছিলে। যিনি বলেছেন তখন তার বয়স ৩৩-৩৪ এর বেশি হবে না। আর সেই সময়ে তিনি কোনো প্রখ্যাত নেতা হিসেবে আওয়ামী লীগে প্রতিষ্ঠিত না।

“সেখানে প্রখ্যাত নেতা ছিলেন আসাদুজ্জামান খান, জুনাব আলী তালুকদার, মোমেন তালুকদার। এদের মতো প্রসিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা থাকতে তাদের খোঁজ-খবর না নিয়ে, জিল্লুর রহমানের মতো নেতার খোঁজ খবর না নিয়ে তাকে মন্ত্রিসভায় আহ্বান করেছেন- এটা একান্তই একটা ভুতুড়ে গল্প।”

বক্তারা সদ্য প্রয়াত স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি শফিউল বারী বাবুর স্মৃতি প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

স্বেচ্ছাসেবক দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমানের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল কাদির ভুঁইয়া জুয়েলের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় বিএনপির জমির উদ্দিন সরকার, রফিকুল ইসলাম মিয়া, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, রুহুল কবির রিজভী, হাবিব উন নবী খান সোহেল, ফজলুল হক মিলন, মীর সরফত আলী সপুসহ স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতারা বক্তব্য রাখেন।

এর আগে শেরেবাংলা নগরে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীরা।